নড়িয়ার রানু বেগম আসমানিদের প্রতিচ্ছবি!

নড়িয়ার রানু বেগম আসমানিদের প্রতিচ্ছবি!


আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ী রসুলপুরে যাও/বাড়ীতো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি । পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার ‘আসমানী’ কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সমাজে বসবাস করা অর্থকষ্টে জর্জরিত চাল-চুলোহীন এক শ্রেণির মানুষের সংগ্রামী জীবনের চিত্র। কবিতার সেই আসমানীদের হয়তো রসুলপুরে গিয়ে বাস্তবে দেখা সম্ভব হবে না। তবে কলাগাছের ঝোপের আড়ালে কয়েক টুকরা ছেঁড়া পলিথিনে মোড়ানো ছাপরা ঘরে বসবাস করা এক অসহায় রানু বেগম (৬৬) যেন আসমানীদের প্রতিচ্ছবিই বটে। যার দিন কাটে মানুষের সাহায্য আর সহযোগিতা নিয়ে।


রানু বেগমের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভূমখাড়া ইউনিয়নের পূর্ব নলতা গ্রামে। ৫০ বছর আগে তার বিয়ে হয় পদ্মা নদীর কোলঘেঁষা সাহেবের চর গ্রামের হাকিম খানের সঙ্গে। একাধিকবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ১০ বছর আগে সহায়-সম্বল সব হারিয়ে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে চলে যান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে তার সন্তানরা কেউ রিকশার চালিয়ে কেউবা দিনমজুরের কাজ করে নিজেদের সংসার চালানো শুরু করেন। তবে সেই সংসারে বেশিদিন জায়গা হয়নি রানু বেগমের। অর্থ কষ্টের সংসারে সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে ৪ বছর আগে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়ি নড়িয়ায় । ভাইদের অবস্থা তেমন ভালো না হওয়ায় অন্যের বাড়িতে দুমুঠো খাবারের বিনিময়ে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন রানু বেগম। অসুস্থ্য শরীরে কাজ করতে না পারায় কয়েকদিন পর সেখান থেকে ও ফিরে আসতে হয় তাকে। বর্তমানে বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া রাস্তর পাশে এক খন্ড জমিতে পলিথিন আর কাপড় দিয়ে মোড়ানো খুপরি ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন তিনি। যেখানে তার সঙ্গী একটি হারিকেন, একটি পাতিল, একটি কলস, একটি প্লেট আর কয়েকটি ছেড়া কাঁথা-কাপড়। রান্নার জন্য কোনো ঘর না থাকায় খোলা আকাশের নিচে রাস্তার ওপর চুলা বানিয়ে সেখানেই করেন রান্না। ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে সেই চুলা নষ্ট হওয়ার ভয়ে আগে থেকে তৈরি করে রাখতে হয় আরও কয়েকটি চুলা। এভাবেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন ষাটোর্ধ্ব এ নারী। রাাস্তার পাশে খাল লাগোয়া একটি জায়গায় কয়েকটি বাঁশের খুঁটির সঙ্গে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে থাকার ঘর। পলিথিনের নিচে মাটিতে প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে করা
হয়েছে শোয়ার জায়গা। একটু অদূরেই রাস্তার পাশে মাটির চুলা। কথা হয় রানু বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান একসময় সুখে স্বামীর ঘর করেছি। নদীতে সব ভেঙ্গে নিয়ে গেলে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে ঢাকা চলে যাই। যখন দেখলাম সন্তানগোই পেট চলে না, তখন টিকতে না পেরে বাপের বাড়ী চলে আসি। ভাইগো সামর্থ্য নেই যে আমার একটা ঘর বানিয়ে দিবো। পরে আমি নিজেই পলিথিন দিয়ে একটা ঘর বানিয়ো থাকতাছি। মানুষের বাড়ীতে কাম কইরা চাইয়া খাই। যখন ঝড়-তুফান আহে তখন এই খুপরি ঘরে বইয়া বইয়া ভিজি। পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ দিলে খাইতে পারি, না দিলে না খাইয়া থাকি। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রানু বেগম। অনেকদিন ধরে আমি অসুস্থ তাই কাম করতে পারি না। ভাইয়া একটু জায়গা দিছে, এ হানে আছি। তাগো অবস্থাও ভালো না। এই শীতে অনেক কষ্ট হইছে আমার। একজন আমারে একটা ছিঁড়া কাঁথা দিছিলো। তাই দিয়েই শীত পার করছি। সরকার থেকে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতো তাহলে হয়তো একটু ভালো থাকতে পারতাম।
রানু বেগমের ভাই নুর হক ছৈয়াল বলেন, একসময় বইনে আমার কাছে থাকতো। পরে আমাগো কষ্ট দেইখা নিজেই রাস্তার পাশে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকে। অনেক কষ্টে থাকে। মাঝেমধ্যে আমাকে ভাত দিলে সেই ভাত আমি অর্ধেক খাই, অর্ধেক বইনেরে দিয়ে যাই। এখন সরকার যদি আমাগো মুখের দিকে চেয়ে একটা ঘর নির্মান করে দিতো তাহলে ও খুব ভালোভাবে থাকতে পারতো।
আমির হোসেন লাকুরিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, উনি রাস্তার মধ্যে একটা ভাঙ্গা ঘরে থাকেন। কেউ যদি খাবার দেয় তাইলে খাইতে পারেন, না দিলে না খেয়ে থাকেন। ঝড়-তুফান আইলে প্লাস্টিক (পলিথিন) উড়াইয়া নিয়ে যায়, আবার সেই প্লাস্টিক এনে কোনোমতে ঠিক ঠাক করে থাকে। আমরা চাই সরকার থেকে তার জন্য একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়া হোক।
নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পারভেজ বলেন, রানু বেগমের বিষয়টি গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে সেখানে পাঠিয়েছি। খুব শিগগির তার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে। বয়স্ক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।

Leave a Reply