শরীয়তপুরের জাজিরার ব্যবসায়ীকে থানায় আটকে ও পিটিয়ে ৭২ লাখ টাকার চেক লিখে নেয়া ও ৪ আসামীকে নির্যাতনের ঘটনায় নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও সদ্য প্রত্যাহার হওয়া পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সুপারকে (এসপি) নির্দেশ দিয়েছেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
জাজিরা পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার একটি মারামারি ও ছিনতাই মামলার চার আসামিকে মারধর করে আহত করার ঘটনায় শরীয়তপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল ইমরান ৭ জুন এই আদেশে স্বাক্ষর করেন।
রোববার আদালতের পুলিশ পরিদর্শকের কার্যালয় থেকে ওই আদেশের কপি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী ৯ জুলাইয়ের মধ্যে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন, ২০১৩-এর ৫ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাজিরার আহাদী বয়াতিকান্দি গ্রামের শাহীন আলম শেখ ও তাঁর সহযোগী ছোট কৃষ্ণনগর গ্রামের সেকান্দার মাদবরের কাছ থেকে গত ২১ মে ১৭ হাজার ডলার,নগদ টাকা ও মুঠোফোন ছিনতাই হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তাতে ২১ লাখ ১৫ হাজার ২৫০ টাকা খোয়া গেছে এমন অভিযোগ এনে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় মামলা করেন শাহীন আলম। এতে বকুল চোকদার, মোঃ সাদ্দাম চোকদার, সাইদুল শেখ, মো. আনোয়ার হোসেনসহ ৯জনকে
আসামি করা হয়।
ভুক্তভোগী ওই চার আসামির ভাষ্য অনুযায়ী ২৯ মে তারা উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের জামিন পায়। এরপর রাতে তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় ছিলেন। সেখানে তাঁদের ওপর চড়াও হয় জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল ব্যাপারী ও ছিনতাই মামলার বাদীর আত্মীয় শহীদুল ইসলাম। পরে রুবেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি শেখ মোস্তাফিজুর রহমানকে মুঠোফোনে কেরানীগঞ্জের ওই বাসায় ডেকে নেয়। সেখানে একটি কক্ষে আটকে তাঁদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
শরীয়তপুরের আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মেজবাহ্ উদ্দিন আহম্মেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করার অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে আমলি আদালত থেকে একটি আদেশ দেওয়া হয়েছে। ওই আদেশের নথি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমাদের কাছে পৌঁছায়। শুক্র ও শনিবার অফিস বন্ধ থাকায় তা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠাতে সম্ভব হয়নি। রোববার সকালে পাঠিয়েছি। ওই আদেশে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল বেপারী মুঠোফোনে বলেন, যার ডলার ও টাকা ছিনতাই হয়েছে তিনি আমার ভাগনে হয়। তাকে সহযোগিতা করার জন্য সামাজিক ভাবে তিনি মামলার আসামিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছিলেন। ঢাকায় তাদের অনুসরণ করে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছেন। তখন হুড়োহুড়িতে তারা ব্যথা পেতে পারে।
গত ২৯ মে রাতে ওই চার যুবককে গ্রেপ্তার করা হলেও ১ জুন তাঁদের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় হুড়োহুড়িতে জখম হয়েছে। তাঁদের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ৪ জুন ওই চার আসামির জামিন ও রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য্য ছিল। ওই দিন আসামিপক্ষের আইনজীবী চারজনকে গ্রেপ্তারের পর শারীরিক নির্যাতনের বিষয় আদালতের নজরে আনেন। আদালত তাঁদের চিকিৎসা দিয়ে মেডিকেল প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ককে নির্দেশ দেন। শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে ৬ জুন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। মেডিকেল প্রতিবেদনের বিষয়ে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুমন কুমার পোদ্দার বলেন, ৪ জুন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল ইমরান চার আসামিকে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন, তাঁদের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ আঘাতগুলো কীভাবে করা হয়েছে, তা বলতে পারবেন না।
মেডিকেল প্রতিবেদনে নির্যাতনের সত্যতা পেয়ে শরীয়তপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল ইমরান তা আদালতে নথিভুক্ত করেন। এরপর তিনি ৭ জুন এ বিষয়ে আদেশ দেন। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন, ২০১৩ এর ৫ ধারার বিধান অনুযায়ী অভিযুক্ত নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এরপর ৯ জুলাইয়ের মধ্য আমলি আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য শরীয়তপুর পুলিশ সুপার কে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী সাদ্দাম চোকদার বলেন, আমাদের চোখ বেঁধে দুই দিন আটকে রেখে নির্মম ভাবে নির্যাতন করে। হাতুড়ি দিয়ে হাড় ও হাত পায়েরজোরায় জোরায় পেটানো হয়েছে। লোহার প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ তুলে দেওয়া হয়েছে। আমার বাঁ চোখে লাথি মেরেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির।
বকুল চোকদার বলেন, পুলিশ আমাদের কে পিটিয়েছে আর জিজ্ঞেস করেছে টাকা কোথায় রেখেছিস? তোদের ৭২ লাখ টাকা দিতে হবে। তোরা টাকা নিয়েছিস তা স্বীকার কর। চোখ বেঁধে দু’জনকে আলাদা করে মারপিট করেছে। দু’জনকে ক্রোস ফায়ার দেওয়া হয়েছে বলে ভয় দেখানো হয়েছে। আমার চাচাতো ভাই সাদ্দামকে মেরে মেঝেতে ফেলে রাখার পর সে পানি খেতে চেয়েছিল। তখন আমার ভাইয়ের মুখে প্রস্রাব করে দিতে বলে। আমি কান্না করি, আবার পেটায়। বাধ্য হয়ে ভাইয়ের শরীরে প্রস্রাব করে দিই।
এসব অভিযোগে গত বুধবার ওসি মোস্তাফিজুর রহমানকে পদ্মাসেতু দক্ষিন থানা থেকে প্রত্যাহার করে শরীয়তপুর পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
আদালতের আদেশের বিষয়ে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার সাইফুল হক বলেন, এসব ঘটনা আমরা তদন্ত করেছি। অভিযোগের বিষয় প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালত থেকে কোনো আদেশ বা নির্দেশনা আমার দপ্তরে এখনো পৌঁছায়নি।